বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি আছেন, যারা ক্লাব ফুটবলে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের সেরাটা দেখাতে পারেননি। জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন অনেক সময় অধরাই থেকে গেছে তাঁদের জন্য। লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর মতো দুই মহাতারকার ক্যারিয়ারেও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ছিল সেই আক্ষেপ।
মেসি ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ ও ২০১৮—প্রথম চার বিশ্বকাপ খেলেও শিরোপার দেখা পাননি। ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জার্মানির কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়। পরে ২০২২ সালে এসে তিনি বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পান।
অন্যদিকে রোনালদোর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার আরও হতাশার। ২০০৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলেও তিনি পর্তুগালকে কখনো ফাইনালে নিতে পারেননি। ক্লাব ফুটবলে ব্যালন ডি’অর, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও অসংখ্য শিরোপা জিতলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি হয়নি।
কিলিয়ান এমবাপ্পের গল্পটা একেবারেই ভিন্ন।বিশ্বকাপের আলো জ্বললেই যেন বদলে যান ফরাসি ফরোয়ার্ড এমবাপ্পে। ক্লাব ফুটবলে তিনি যেমন ভয়ংকর, জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বকাপের মঞ্চে যেন আরও বেশি প্রাণবন্ত, আরও বেশি ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠেন।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকে চমকে দেন এমবাপ্পে। পুরো টুর্নামেন্টে চার গোল করে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন। ফাইনালেও গোল করেন তিনি। সেবারই তিনি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা তরুণ ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
এরপর আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ। সেখানে এমবাপ্পে যেন নিজের আরেকটি সংস্করণ উপহার দেন ফুটবল বিশ্বকে। পুরো আসরে আট গোল করে জেতেন গোল্ডেন বুট। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে রোমাঞ্চকর ফাইনালে করেন দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিকের মতো বিরল কীর্তি গড়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লেখান তিনি।
তবে সেখানেই থেমে থাকেননি এমবাপ্পে। ২০২৬ বিশ্বকাপেও শুরু থেকেই ছুটছেন দুরন্ত গতিতে। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি ফ্রান্সের সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলদাতাদের কাতারে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যাও পৌঁছে গেছে কিংবদন্তিদের পাশে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মাত্র তিনটি বিশ্বকাপ খেলেই এমবাপ্পে বিস্ময়কর সব রেকর্ড গড়ে ফেলছেন, যেগুলোর জন্য অনেক কিংবদন্তিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। যেখানে মেসি ও রোনালদোকে বিশ্বকাপে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, সেখানে এমবাপ্পে শুরু থেকেই হয়ে উঠেছেন টুর্নামেন্টের প্রধান আকর্ষণ।
ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, ক্লাব ও জাতীয় দল—দুই জায়গায় সমান আধিপত্য বিস্তার করার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রজন্মে এমবাপ্পের তুলনা খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাঁর গতি, গোল করার ক্ষমতা, বড় ম্যাচে নিজেকে মেলে ধরার মানসিকতা এবং চাপের মুহূর্তে জ্বলে ওঠার অসাধারণ সামর্থ্য তাঁকে আলাদা করে দিয়েছে।
বিশ্বকাপ যেন তাঁর জন্য অন্য এক মঞ্চ। সেই মঞ্চে নামলেই এমবাপ্পে হয়ে ওঠেন আরও দুরন্ত, আরও অপ্রতিরোধ্য। তাই ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেই এখন মজা করেই বলেন—বিশ্বকাপ এলেই কিলিয়ান এমবাপ্পে যেন ‘পাগলা ঘোড়া’ হয়ে যান, যার দৌড় থামানো প্রায় অসম্ভব।