আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। প্রথমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপে খেলতে এসেই আলোচনায় দেশটি। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ১৫ জুন স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে তারা।যার ফলে সারা বিশ্বেই তাদের নিয়ে হইচই, আলোচনা। এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন দেশটির গোলরক্ষক ভোজিনিয়া।
ম্যাচে স্পেন একের পর এক আক্রমণ করেছে, গোলের উদ্দেশ্যে মোট ২৭টি শটও নিয়েছে, তবে তারা গোল করতে পারেনি। কারণ, কেপ ভার্দের গোলবারের নিচে যেন এক অদম্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ভোজিনিয়া। অসাধারণ সব সেভ করে তিনি স্পেনকে হতাশ করেন। তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে কেপ ভার্দে পায় ঐতিহাসিক এক পয়েন্ট। ম্যাচ শেষে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জিতেছেন তিনি।
ভোজিনিয়া নামে পরিচিত হলেও তাঁর পুরো নাম জোসিমার ঝোজেহ এভোরা দিয়াশ। বয়স ৪০ বছর।যখন বেশিরভাগ ফুটবলার অবসর নেন, তখন তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের জীবনের সেরা পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন।
ভোজিনিয়ার জন্মও বিশ্বকাপের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে। ১৯৮৬ সালের ৩ জুন, মেক্সিকো বিশ্বকাপ চলাকালে তাঁর জন্ম। জন্মের আগের দিন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড হোর্হে ভালদানো একটি ম্যাচে জোড়া গোল করেছিলেন। এ কারণে তাঁর বাবা ছেলের নাম ‘ভালদানো’ রাখতে চেয়েছিলেন। তবে দেশের নাম নিবন্ধনের নিয়মের কারণে তা সম্ভব হয়নি।
পরে তিনি ছেলের নাম রাখেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি রাইটব্যাক জোসিমারের নামে। মেক্সিকো বিশ্বকাপে জোসিমারের দারুণ খেলা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘জোসিমার’ নামটি হারিয়ে যায়, সবাই তাঁকে চিনতে শুরু করে ‘ভোজিনিয়া’ নামে।
তাঁর নামের পেছনেও আছে আবেগঘন গল্প। ছোটবেলায় ভোজিনিয়াকে বড় করেছেন তাঁর দাদা-দাদি। বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীতে, আর মা সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। দাদা-দাদিই ছিলেন তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ। তাঁদের দেওয়া ডাকনামই ছিল ‘ভোজিনিয়া’। পর্তুগিজ ভাষায় যার অর্থ অনেকটা ‘আদরের ছোট্ট দাদু’।
কেপ ভার্দের সাও ভিসেন্তে শহরে বেড়ে ওঠা ভোজিনিয়া আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন। অ্যাঙ্গোলার একটি ক্লাবে খেলার সময় দলে আরেকজন গোলরক্ষকের নামও ছিল জোসিমার। তখন বিভ্রান্তি এড়াতে তিনি জার্সিতে নিজের ডাকনাম ‘ভোজিনিয়া’ ব্যবহার শুরু করেন। তারপর থেকে এই নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।
আরেকটি মজার বিষয় হলো, যে মেক্সিকো বিশ্বকাপ চলাকালে তাঁর জন্ম হয়েছিল, সেই মেক্সিকো এবারও বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ। আর এই আসরেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে এসেছেন তিনি।
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচসেরা হওয়ার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ভোজিনিয়া। চোখের জল মুছতে মুছতে স্মরণ করেন প্রয়াত দাদা-দাদিকে। একই সঙ্গে আক্ষেপ করেন মাকে নিয়ে।
তিনি বলেন, ‘আমার মা এখানে আসতে পারেননি। ভিসার খরচের টাকা সময়মতো জোগাড় করতে পারিনি। খুব চেয়েছিলাম, মা মাঠে বসে আমার খেলা দেখুক। তবে টাকার অভাবে তা সম্ভব হয়নি।’
স্পেন ম্যাচের আগে ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারী ছিল প্রায় ৫০ হাজার। ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬০ লাখে। এক রাতেই অচেনা এক গোলরক্ষক থেকে বিশ্বকাপের নতুন নায়কে পরিণত হয়েছেন কেপ ভার্দের ভোজিনিয়া।