গতি আর রোমাঞ্চ নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে আবির্ভাব নাহিদ রানার। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলার তিনি। সহজাত গতির সঙ্গে বোলিংয়ে যোগ করে চলেছেন তিনি আরও অনেক অস্ত্র। পরিণত ক্রিকেট মস্তিষ্কের প্রমাণ দিয়ে চলেছেন ম্যাচের পর ম্যাচে। সাফল্যও ধরা দিচ্ছে তার হাতে। ১০ টেস্টে ২৭ উইকেট হয়ে গেছে তার। ছোট্ট ক্যারিয়ারেই দুটি বড় জয়ে তার ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডিতে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কিংস্টনে।
নাহিদ রানা লাল বলের সাফল্য বয়ে এনেছেন সাদা বলেও। পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টানা দুটি সিরিজ জয়ে তিনি ম্যান অব দা সিরিজ। টি-টোয়েন্টিতে দেশের হয়ে এখনও পর্যন্ত মাঠে নেমেছেন কেবল একটি ম্যাচে। খুব ভালো করতে পারেননি অভিষেকে। তবে বিপিএল ও পিএসএলে দেখিয়েছেন, টি-টোয়েন্টিতেও তিনি কতটা কার্যকর হতে পারেন। নিশ্চিতভাবেই সামনে দেশের জার্সিতে ছোট সংস্করণেও তাকে নিয়মিত দেখা যাবে।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের পর ওয়ানডে অধিনায়ক মিরাজ তো স্তুতির জোয়ারে ভাসালেন ২৩ বছর বয়সী পেসারকে। শুধু স্তুতি গুরুত্বপূর্ণ নয়, তার দরকার সঠিক যত্ন ও গাইডলাইন।
মিরাজ বললেন, নাহিদ রানা অবশ্যই আমাদের দেশের জন্য অনেক বড় একটি সম্পদ। আমরা চেষ্টা করব ওকে যত্ন করতে। ও যেভাবে মেইনটেইন করছে নিজেকে, এটা আসলে একটা দলের জন্য অনেক অনেক সুবিধা এবং গত দুটি সিরিজ যেভাবে বোলিং করেছে, ও একটা গ্রেট মোমেন্টাম নিয়ে আসে সবসময়। ও যেভাবে বল করছে, এটা চালিয়ে যেতে পারলে বাংলাদেশ দলের জন্য অনেক অনেক ম্যাচ জেতাতে পারবে।
মিরাজ আরও বললেন, আমাদের দেশের ক্রিকেটের জন্য ওকে একটা আশীর্বাদ মনে করি আমি এবং এরকম যদি টানা ১৪৫, ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারে, এটা প্রতিপক্ষ দলের জন্য বাড়তি চাপের হবে। ও প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একই গতিতে বল করতে পারে, এটা একটা বড় ব্যাপার। সবচেয়ে বড় কথা, ও অনেক আত্মবিশ্বাসী থাকে মাঠের ভেতরে। যখনই আমি ওকে কিছু বলি, ও বলে ‘ভাই, আমার বিশ্বাস আছে ভালো করতে পারব।’ এই ব্যাপারটা একজন অধিনায়ককে অনেক স্বস্তি দেয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, সেই স্বস্তিটা কতদিন থাকবে। চোটের চোখরাঙানি তো সবসময়ই থাকবে! নাহিদ রানার সঠিক যত্ন কি নিতে পারবে বিবিসি?
নাহিদ রানাকে যত্ন নিয়ে সামলানোর ব্যাপারটি আলোচনায় আসছে। তার অনুশীলন, ম্যাচ খেলার পরিমাণ, কোন কন্ডিশনে কতটা খেলানো হবে, তার সার্বিক ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও রিকভারি, সবকিছুই হতে হবে সুনিপুণ।
অধিনায়ক মিরাজ ওয়ানডে সিরিজ শেষে বললেন, নাহিদ রানাকে সতর্কতায় সামলানোর ব্যাপারটি তাদের ভাবনায় আছে।
মিরাজ বললেন, আমরা অবশ্যই ওকে অনেক টেক কেয়ার করব এবং এটা আমাদেরই দায়িত্ব ওর যত্ন নেওয়াটা। এরকম একজন ক্রিকেটারকে যত্নে রাখতে পারলে আমাদের দলের জন্যই অনেক ভালো। অনেক সময় বিশ্রাম দিয়ে খেলাতে হবে, সুযোগ যখন মিলবে। টানা খেলালে অনেক সময় ইনজুরি চলে আসতে পারে, আমরা ওই জিনিসটা মাথায় রাখব অবশ্যই।
বাংলাদেশের তিন সংস্করণের একাধিক অধিনায়ক। প্রত্যেকেই নিজ দলে নাহিদকে অবশ্যই চাইবেন। সেখানেও সমন্বয়টা জরুরি।
নাহিদ রানাকে সামলানোর ব্যাপারটি আরেকটু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। তিনি বললেন, ২৩ বছর বয়সী ফাস্ট বোলারকে সামলে রাখার ছক তাদের প্রতিনিয়ত চলতে থাকবে।
হাবিবুল বাশার আরও বললেন, সুনির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা আমাদের মাথায় নেই যে এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ এতগুলো ম্যাচ খেলাব। আমরা সিরিজ বাই সিরিজ দেখব। ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট তো আসলে ফিজিও-ট্রেনাররাই মূলত খেয়াল রাখবেন। তাদের সঙ্গে আমাদের প্রতিনিয়ত আলোচনা চলতে থাকবে।
নাহিদের ব্যাপারে তিনি আরও বললেন, একটা ব্যাপার হলো, কোনো পেসারকে বা কোনো ক্রিকেটারকেই একদম ইনজুরি মুক্ত রাখা হবে না। ইনজুরি হবেই। তবে সেটা যত কম আসে বা বড় কোনো ইনজুরিতে যেন না পড়ে, সেটা আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব। পাশাপাশি যথেষ্ট বিশ্রাম নিয়ে ম্যাচগুলি যেন তরতাজা হয়ে খেলতে পারে, সেই চেষ্টা থাকবে।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের স্কোয়াডে নাহিদকে না রাখার পরও পিএসএল খেলার ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি তার শারীরিক ধকলের কথা ভেবেই।
বাশার বললেন, এজন্যই ওকে পিএসএলে পাঠাচ্ছি না আমরা। কিছুদিন পর থেকে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট। এর আগে সময়টা খুব কম। এই গরমে তিনটি ম্যাচ খেলার পর ওর বিশ্রাম প্রয়োজন।
বাশার আরও বললেন, ওকে তো খেলাতেও হবে। না খেলিয়ে বসিয়ে রাখলে তো হবে না। তিনটি ফরম্যাটেই ওকে আমরা খেলানোর চিন্তা করছি। এজন্যই ফিজিও-ট্রেনার, টিম ম্যানেজমেন্ট ও আমরা সবাই সমন্বয় করেই সিদ্ধান্ত নেব।
গতির রোমাঞ্চ নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে আবির্ভাব হয়েছিল মাশরাফি বিন মুর্তজা ও তালহা জুবায়েরের। অতটা গতিময় না হলেও দারুণ সম্ভাবনাময় ছিলেন মোহাম্মদ শরিফ। কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরুতে অতি ব্যবহারে চোটের কবলে পড়তে হয়েছিল তাদের প্রত্যেককেই। সম্ভাবনাকে পূর্ণতা দিতে পারেননি কেউই। মাশরাফি তবু গতি হারিয়ে লড়াইয়ের পর লড়াইয়ের কাব্য রচনা করে ক্যারিয়ারকে দীর্ঘায়িত করত পেরেছেন। অন্য দুজনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে প্রায় অঙ্কুরেই।
তিনজনকেই তখন কাছ থেকে দেখেছেন হাবিবুল। সেসবের পুনরাবৃত্তি এই সময়ে এসে আর হবে না বলেই মনে করেন সাবেক এই অধিনায়ক।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বাশার বললেন, সেই সময়ের বাস্তবতা তো আলাদা ছিল। এত সচেতনতা ছিল না। যে ভালো করত, তাকে যত বেশি সম্ভব ম্যাচ খেলানোর ভাবনা থাকত। ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট তখন এতটা গুরুত্ব পায়নি। তখন তিন ফরম্যাটে টানা খেলার ব্যাপারও ছিল না। সবকিছু আরও পেশাদার হয়েছে, অনেক সায়েন্টিফিক ও ডাটাভিত্তিক হয়ে গেছে। ওদের প্রতিটি পদক্ষেপের ডাটা থাকে।
বাশার আরও বললেন, আরেকটা ব্যাপার হলো, এখন তো আমাদের হাতে অপশনও আছে। অনেক পেসার আছে। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলানোর সুযোগ আছে। তার পরও ইনজুরি হবে। কিন্তু আমরা ওর ম্যানেজমেন্টে কোনো ঘাটতি না রাখার চেষ্টা করব।
হাবিবুলের কথা মিথ্যা নয়। এখন এমনকি অনুশীলনে কোন পেসার কবে কত ওভার বোলিং করবেন, কত ভাগ ‘ইনটেনসিটি’ দিয়ে বোলিং করবেন, ম্যাচের আগে গা গরমের সময় কয় ওভার বোলিং করবেন, সবকিছু আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। তাদের সবকিছুই খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। তার পরও চোট হানা দেয়। নাহিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা এখানেই জরুরি। কোনো স্ট্রেস ফ্র্যাকচার, হাঁটু বা কাঁধের কোনো অস্ত্রোপচার বা বড় কোনো চোটের পর গতিময় পেসারদের গতি হারিয়ে যাওয়ার অসংখ্য নজির ক্রিকেট ইতিহাসে আছে। বাংলাদেশের সোনার ডিম পাড়া হাঁসের পেট কাটার আয়োজন তাই করা যাবে না।
দায়িত্বটা যেমন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সংশ্লিষ্ট সবারই, তেমনি নাহিদের নিজেরও। ফাস্ট বোলিং তো স্রেফ ক্রিকেটের একটি ধরন নয়, এটি পুরোপুরি একটি ‘লাইফ স্টাইল।’ মাঠের ভেতরের মতো বাইরের জীবনও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক হাতছানি থেকে নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, শরীরকে পোক্ত হওয়ার যথেষ্ট সময় দেওয়া, খাদ্যাভ্যাস, সঙ্গ, এমনকি পরিবার, সবকিছুই এটির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
সবকিছুই যদি এক সুতোয় গেঁথে রাখা যায়, নাহিদের গতির রথ ছুটবে সম্ভাবনার পথ ধরে পূর্ণতার ঠিকানায়।