সংবাদ সম্মেলনে তখন তাওহিদ হৃদয়ের কথা বলার পালা। সঞ্চালক ও বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজর রাবীদ ইমার বললেন, “হৃদয় কিছুক্ষণ আগে আমাকে বলছিল যে, ‘আমি কিন্তু স্কুল ক্রিকেট লেজেন্ড’।” তার কথা শুনে লাজুক হাসি দেখা গেল হৃদয়ের মুখে। হেসে উঠলেন কক্ষের সবাই। মঞ্চের আরেকপাশে থাকা নাজমুল হোসেন শান্ত হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে চেষ্টা করলেন টিপ্পনি কাটার।
বাংলাদেশের স্কুল ক্রিকেটের পরিসংখ্যান সেভাবে রাখা হয় না। তবে স্কুল ক্রিকেটে দারুণ খেলেই উঠে এসেছেন হৃদয়। দেশের টেস্ট অধিনায়ক শান্তর উত্থানের পেছনেও বড় অবদান ছিল স্কুল ক্রিকেটের। সাড়াজাগানো স্কুল ক্রিকেটের নতুন মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে ফের।
এক দশক ধরেই স্কুল ক্রিকেটের পথচলার সঙ্গী প্রাইম ব্যাংক। এবার একাদশবারের মতো হতে যাচ্ছে প্রাইম ব্যাংক জাতীয় স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। ৬৪ জেলায় বিশাল আয়োজন শুরু হচ্ছে শুক্রবার।
বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট উৎসব বলা হয় এটিকে। এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে ৩৫০টি স্কুল। টুর্নামেন্টে খেলবেন প্রায় ৮ হাজার ৭০০ ক্রিকেটার। মোট ম্যাচ ৬৫১টি।
২০১৫ সালে প্রাইম ব্যাংক যুক্ত হওয়ার পর স্কুল ক্রিকেটে বিভিন্ন সময়ে অংশ নিয়েছে ৩ হাজার ৫০৭ স্কুল। দেশের নানা প্রান্তে ম্যাচ হয়েছে মোট ৬ হাজার ১৯৫টি, খেলেছেন ৭৬ হাজার ২৩৫ ক্রিকেটার।
সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন সাবেক জাতীয় অধিনায়ক হাবিবুল বাশার। এ মাস থেকে জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক হিসেবে পথচলা শুরু হয়েছে তার। তবে তিনি গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের অপারেশন্স প্রধান থাকার সময়ই এবারের স্কুল ক্রিকেটের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল।
হাবিবুল বললেন, ভবিষ্যতে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন থেকে না হলেও মনের আনন্দে স্কুলের ছেলেরা এই আসরে খেলুক।
“আমরা চাই আরও বেশি সংখ্যক ছেলেরা ক্রিকেট খেলুক, আরও বেশি ক্রিকেটার, স্কুল ক্রিকেট যারা খেলবে, তারা সবাই যে ক্রিকেটার হতে হবে, তা বলছি না, তবে আমরা চাই যে সবাই ক্রিকেটটা খেলুক। স্কুলে যারা যারা আছে, সবাই ক্রিকেট খেলুক। আগে আমরা শিক্ষা সচিবের সাথে আলাপ করছিলাম যে, কীভাবে আরও স্কুল সম্পৃক্ত করা যায়।”
“প্রাইম ব্যাংকের সহায়তায় ক্রিকেট বোর্ড সবকিছুই প্রোভাইড করে এখন। তারপরও অনেক সময় অনেক স্কুলকে আমাদের আমন্ত্রণ জানাতে হয়। এমন না যে অনেক স্কুলগুলি খুব আগ্রহ নিয়ে খেলতে আসে। প্রতিটি স্কুলের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা আগে ছিল, আমাদের সময় ছিল যে স্কুলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, সেটা যেন ফিরিয়ে নিয়ে আনতে পারি। কিছু পরিকল্পনা আমরা এই টুর্নামেন্টে শুরু করছি এ বছর। আশা করি সফল হবে।”
হাবিবুল জানালেন, ফাইনাল ম্যাচটি মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে আয়োজনের চেষ্টা করবেন তারা। স্কুল ক্রিকেটের ফাইনাল আগেও একাধিকবার হয়েছে হোম অব ক্রিকেটে।
প্রাইম ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজিম এ চৌধুরী বললেন, ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তারা স্কুল ক্রিকেটের সঙ্গে থাকতে চান আরও অনেক দিন। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের স্কুল ক্রিকেট আয়োজনে বিসিবিকে অনুরোধ করলেন তিনি।
নাজিম এ চৌধুরী আরও বলেন, “বিসিবিকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আমাদেরকে পার্টনার হিসেবে রাখার জন্য। সামনের দিনগুলোতে উনারা সুযোগ দিলে যতদিন এই টুর্নামেন্ট চলবে, ততদিনই প্রাইম ব্যাংক সঙ্গে থাকবে। কারণ ক্রিকেট সত্যি বলতে আমাদের আবেগের জায়গা। আমরা শুধু যে কর্পোরেট দায়বদ্ধতা থেকে এখানে এসেছি, তা নয়। আমরা ক্রিকেটকে ভালোবাসি দেখে আমাদের দায়বদ্ধতা আছে।”
নাজিম এ চৌধুরী আরও বলেন, আমাদের একটা দাবি থাকবে বিসিবির কাছে যে, আমরা যেমন স্কুল ক্রিকেট ছেলেদের জন্য করছি, এরকম মেয়েদের জন্য কেন নয়? আমাদের মেয়েদেরকেও যাতে আমরা এর মধ্যে আনতে পারি, স্পন্সর হিসেবে আমাদের অনুরোধ থাকবে বিসিবিকে এই ব্যাপারে কিছু করার জন্য।
জাতীয় দলের ক্রিকেটার তাওহিদ হৃদয় শুরুতে বললেন, “সত্যি কথা বলতে, স্কুল ক্রিকেটের বিষয়ে যদি কিছু বলতে চাই একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি।” সেই আবেগের পেছনের কারণও তুলে ধরলেন তিনি।
“আমার জীবনের শুরুটাই হয়েছে এই স্কুল ক্রিকেট দিয়ে। আমি বগুড়া পুলিশ লাইন্স থেকে পড়াশোনা করেছি। স্কুল ক্রিকেটের অনেক স্মৃতি আছে এখনও, সেগুলো মনে পড়ে। স্কুল ক্রিকেট এমন একটা জায়গা, যেখান থেকে অনেক ক্রিকেটার উঠে এসে অনেক জায়গায় অংশ নিয়েছে। এমনকি আমি চার বছর খেলেছি, আমার বগুড়া পুলিশ লাইন্স বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে একবার।”
জাতীয় দলের ক্রিকেটার তাওহিদ হৃদয় আরও বলেন, আমি সবসময় স্কুল ক্রিকেট ফলো করি এবং আমি যদি ভুল না করে থাকি, গত দু্ই-এক বছর টসের মাধ্যমে চ্যাম্পিয়নশিপ নির্ধানিত হয়েছে, কারণ বৃষ্টিতে কারণে খেলা হয়নি। এটা এমন একটা টুর্নামেন্ট, যে এখান থেকে অনেক ক্রিকেটার উঠে আসে এবং ভবিষ্যতে উঠে আসবে। আমি বা আমরা চাই যে, এই টুর্নামেন্টটা যেন বৃষ্টির মৌসুমে না হয়ে একটু আগে করা যেত, তাহলে ক্রিকেটাররা সব ম্যাচ খেলতে পারত।”
স্কুল ক্রিকেটের একটি টুর্নামেন্টে দারুণ পারফর্ম করে দেশের ক্রিকেটে প্রথম নজর কেড়েছিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। সেই টুর্নামেন্ট ছিল দেশের বাইরে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই স্কুল ক্রিকেটের সেরা ক্রিকেটারদের দেশের বাইরে খেলানো ব্যবস্থা করতে বললেন তিনি।
“আমার তো শুরুটা হয়েছিল বিসিবির বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট দিয়ে। সৌভাগ্যবশত, অনূর্ধ্ব-১৭ দলে খেলার সময় স্কুল ক্রিকেটের একটা টুর্নামেন্টে কেরালায় খেলতে যাওয়ার একটা সুযোগ হয়েছিল। ওই টুর্নামেন্টে আমি সেরা ক্রিকেটার হয়েছিলাম। তারপর ওখান থেকে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলার সুযোগ তাড়াতাড়িই হয়ে গিয়েছিল আমার।”
শান্ত আরও বলেন, যদি সম্ভব হয় প্রত্যেকটা স্কুল থেকে সেরা ক্রিকেটার বাছাই করে যদি আমরা বাইরে কোনো দেশের সঙ্গে খেলতে পারি বা কোনো রাজ্যের সঙ্গে খেলতে পারি, তাহলে আমার মনে হয় যে ক্রিকেটারদের জন্য আরও ভালো হবে এবং এই টুর্নামেন্টটা আরও আগ্রহের সঙ্গে ক্রিকেটাররা খেলতে চাইবে বা স্কুলগুলো অংশ নিতে চাইবে।
স্কুল ক্রিকেটের সবশেষ আসরের স্কলারশিপ পেয়েছে যারা, তাদের নামও ঘোষণা করা হয় এ দিন। বৃত্তি প্রাপ্ত ক্রিকেটারের সংখ্যা এবার ১৫ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ২৫ জন। আর্থিক অঙ্ক ৬০ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার।
বৃত্তিপ্রাপ্ত ২৫ ক্রিকেটার:
ব্যাটার/উইকেটকিপার:
আদৃত ঘোষ (ঢাকা মেট্রো), আকাশ রায় (রাজশাহী), কাবিদ আলি সিয়াম (যশোর), মোস্তাকিম হাওলাদার (ঢাকা মেট্রো), সাকিব আহমেদ (ঢাকা মেট্রো), তৌফিকুর রহমান (ঢাকা মেট্রো), আদিল চৌধুরী (চট্টগ্রাম), ফারহান সাদিক (রাজশাহী), রিয়াদ শেখ (বগুড়া), মাইন হোসেন (ঢাকা মেট্রো), বায়জিদ বোস্তামি (বগুড়া), সাবিক আল শামান (ঢাকা মেট্রো), আব্দুল্লাহ আল মিরাজ (লালমনিরহাট), হামিম সারোয়ার সিয়াম (ঢাকা মেট্রো)
পেসার:
আল আমিন হোসেন (ময়মনসিংহ), মোহাম্মদ ইব্রাহিম (চট্টগ্রাম), ছোটন মিয়া (সিলেট) সাথিল হোসেন (ঢাকা মেট্রো), আবরার ইয়ামিন (পঞ্চগড়)।
স্পিনার :
শচীন চন্দ্র রায় (ঠাকুগাঁও), নাঈম ইসলাম (রাজশাহী), আরিফুজ্জামান (যশোর), সামিউল ইসলাম (দিনাজপুর), সায়েম পারভেজ (ঢাকা মেট্রো), আশরাফুল ইসলাম (রাজশাহী)।