১৫ জুন ২০২৪

ফার্মেসি কেন ও কোথায় পড়বেন?

মো. এনামুল হক
১৬ মে ২০২৪, ১৮:৩৪
অনেকে ফার্মেসি বিভাগে পড়তে যান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে ফার্মেসি বিষয়ে শিক্ষার যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৪ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি  বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি প্রোগ্রাম পড়ানো হয়। মানসম্মত ওষুধ সরবরাহ থেকে শুরু করে ওষুধ নিয়ে গবেষণা—একজন ফার্মাসিস্ট বহুমুখী কাজের দায়িত্বে থাকেন। তাই বর্তমানে কদর বাড়ছে ফার্মেসির গ্র্যাজুয়েটদের। এ লেখায় তুলে ধরা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি প্রোগ্রামে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের নানা বিষয়।

ফার্মেসি প্রোগ্রামে পড়তে চাইলে এসএসসি ও এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে উভয় পরীক্ষায় জিপিএ সর্বনিম্ন ৭-৮ পয়েন্ট হতে হবে। বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী, গণিত বিষয়ে ২.৫ পয়েন্ট হতে হবে। এ ছাড়া জীববিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞান আবশ্যিক বিষয় হিসেবে থাকতে হবে। তবে দেখা যায়, যাঁদের পয়েন্ট ভালো, তাঁরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পেয়ে যান। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিষয়ে স্নাতকে ভর্তি হতে ‘ক’ ইউনিট কিংবা জীববিজ্ঞান অনুষদের পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে।

কোথায় কোথায় ভর্তি হওয়া যায়
ফার্মেসি পড়ার জন্য পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা ও কুমিল্লা (বিশ্ববিদ্যালয়) এবং যশোর, পাবনা, গোপালগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নোয়াখালী (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) অন্যতম। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়, মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়, আশা, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনাল, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি অন্যতম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি রয়েছে। কেউ চাইলে পিএইচডি ডিগ্রিও করতে পারবেন। এ ছাড়া অনেক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ফার্মেসিতে চার বছরের ডিপ্লোমা করা যাবে। আবার কেউ চাইলে তিন মাসে ফার্মেসি সার্টিফিকেট রেজিস্ট্রেশন কোর্স করতে পারবেন। তাঁরা মূলত ওষুধ বিপণনে ও বিক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। এর জন্য মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পাস হতে হবে। 

কী কী বিষয়ে পড়ানো হয়
ফার্মেসি মূলত মেডিকেল সায়েন্সের একটি অংশ। মেইন কোর্স হচ্ছে ‘ফার্মাকোলজি’, যেখানে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ওষুধের অ্যাকশন ও শরীরে যাওয়ার পর ওষুধ কীভাবে কাজ করছে সে-সম্পর্কে জানা যায়। ‘ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি’ বিষয়ে ওষুধ তৈরির বিষয়াদি সম্পর্কে পড়ানো হয়। ‘মেডিসিনাল কেমিস্ট্রি’তে মেডিসিন আবিষ্কার সম্পর্কে পড়াশোনা করা হয়। ‘বায়োফার্মাসিউট্রিকস’ বিষয়ে শরীরে ওষুধ কীভাবে কাজ করছে এবং তা ছড়িয়ে পড়ছে, সে-সম্পর্কে পড়ানো হয়। ‘প্যাথোলজি’ বিষয়ে রোগ নির্ণয় করে ওষুধ ব্যবহার সম্পর্কে পড়ানো হয়। ‘ড্রাগ অ্যান্ড ডিজিজ ম্যানেজমেন্ট’ বিষয়ে কারও অসুখ হলে কোন ওষুধ দিয়ে ম্যানেজ করা যায়, সে-সম্পর্কে পড়ানো হয়। এ ছাড়া ইমিউনোলজি, মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফিজিওলজি এবং অ্যানাটমিও পড়ানো হয়। ব্যাচেলর ডিগ্রিধারী রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্টরা ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট, ডিপ্লোমাধারীরা ‘বি’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট এবং ফার্মেসি সার্টিফিকেট রেজিস্ট্রেশনধারীরা ‘সি’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট বলা হয়।

চাকরির সুযোগ কেমন
ফার্মেসিতে গ্র্যাজুয়েটদের ভালো ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানিতে প্রডাকশন, প্রডাক্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, ট্রেনিংসহ বিভিন্ন বিভাগে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের চাহিদা রয়েছে। ফার্মাসিস্টরা ওষুধ বা ফার্মেসি-সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, মানোন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ওষুধ প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত ‘ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক’ সংস্থা দেশের প্রতিটি জেলা শহরে রয়েছে। এর দ্বারা ফার্মেসির ব্যবসাগুলো তদারকি করা হয়। ‘বিসিএসআইআর’ নামক সংস্থা রোগ নিয়ে গবেষণা করে থাকে। যেখানে চাকরির সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি সব চাকরিতে যোগদান করতে পারবেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ওষুধশিল্প ছাড়াও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ফার্মাসিস্ট, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট, ফার্মেসি ম্যানেজার হিসেবে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়।

পড়ার খরচ কেমন
ফার্মেসিতে চার ও পাঁচ বছর মেয়াদি কোর্স পড়ানো হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমন খরচ নেই বললেই চলে। পাবলিকে পুরো কোর্সে ৩০-৪০ হাজার খরচ হতে পারে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যালেচর প্রোগ্রামের জন্য সাড়ে ৮ লাখ থেকে ১৩ লাখের মতো খরচ পড়বে। আবার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ লাখ থেকে ৮ লাখ টাকায় বি.ফার্ম (ব্যাচেলর অব ফার্মাসি) কোর্স করা যায়। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। খরচ পড়বে ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা।

উচ্চশিক্ষার সুযোগ-সুবিধা
ফার্মেসি একটি যুগোপযোগী প্রোগ্রাম। এর মূল কাজ হচ্ছে ওষুধ আবিষ্কার, উৎপাদন ও গুণগত মান উন্নয়ন। এর জন্য উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অনেক সুযোগ রয়েছে। ফার্মেসি পড়ে ফার্মাকোলজি, বায়োটেকনোলজি, বায়োইনফরমেটিকস, নিউরোসায়েন্স, জেনেটিকস ইনফরমেশনসহ অনেক বিষয়েই উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই ফার্মেসি প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। আমেরিকায় এই প্রোগ্রামের জন্য উচ্চশিক্ষার (মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি) সুযোগ রয়েছে। আমেরিকাসহ কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য, জাপান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। ফার্মাসিউট্রিকস, ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি, ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি, নিউরোলজি, বায়োমেডিকেল সায়েন্স, ফিজিওলজি, প্যাথোলজি ও টক্সিকোলজি প্রোগ্রামগুলোতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পাবলিক হেলথ, বায়োকেমিস্ট্রি, মলিকুলার বায়োলজি, ইমিউনোলজি প্রোগ্রামে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। 
অনুলিখন: আনিসুল ইসলাম নাঈম