০২ জুলাই ২০২৬

শৃঙ্খলা আর অধ্যবসায়েই সাফল্য, বললেন পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম তানভীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
০২ জুলাই ২০২৬, ১৬:৩৭
তানভীর রহমান সংগৃহীত

মধ্যবিত্ত এক শিক্ষক পরিবারের সন্তান তানভীর রহমান। ছোটবেলায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। হারিকেন কিংবা মোমবাতির আলোয় রাত জেগে পড়াশোনা করেই বড় হয়েছেন তিনি। সীমিত সামর্থ্যের জীবন পেরিয়ে প্রথমবার বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় অংশ নিয়েই ৪৭তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়ার বিরল গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের ফলাফলে তানভীর রহমানের সাফল্যে পরিবার, স্বজন এবং নেত্রকোনার মানুষ আনন্দে উচ্ছ্বসিত। 

নেত্রকোনা সদর উপজেলার রায়দুম বাগড়া গ্রামের বাসিন্দা তানভীর। তাঁর বাবা আবদুর রহমান নেত্রকোনার শামছুদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মা রিনা পারভীন গৃহিণী। তিন ভাইবোনের মধ্যে তানভীর সবার বড়। তাঁর মেজো বোন আফসানা রহমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ছোট বোন নুজহাত-ই-রহমান নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। তবে শুধু বই নয়, খেলাধুলাতেও সমান উৎসাহী ছিলেন। তখন এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় প্রায় প্রতিদিনই হারিকেন বা মোমবাতির আলোয় পড়তে হতো। আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও পরিবারের উৎসাহ আর নিজের অধ্যবসায় তাঁকে কখনো স্বপ্ন দেখা থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

ছেলের শৈশবের কথা স্মরণ করে তানভীরের মা রিনা পারভীন বলেন, আমাদের ছোট্ট একটি টিনের ঘর ছিল। একই ঘরে থাকা, খাওয়া আর বাচ্চাদের পড়াশোনা—সবই চলত। অনেক কষ্টের মধ্যেও তানভীর কখনো হাল ছাড়েনি। ছোটবেলা থেকেই সে খুব নিয়মিত ছিল। অযথা আড্ডা বা সময় নষ্ট করত না। আজকের সাফল্য তার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, শৃঙ্খলা আর একাগ্রতার ফল।

তানভীর ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি এবং ২০১৯ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ২০২৫ সালে স্নাতক শেষ করে একই বছরের ১ জুন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে যান। প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। এর আগে ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে সুপারিশও পেয়েছিলেন।

তানভীর জানান, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেই তাঁর শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিল। তিনি বলেন, আমার বাবা শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই এই পেশার প্রতি আমার আলাদা শ্রদ্ধা আছে। আমি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চেষ্টা করেছিলাম। সুযোগ না পেলেও কখনো আত্মবিশ্বাস হারাইনি। সফল হব, এ বিশ্বাস সব সময় ছিল। তবে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হব, সেটা সত্যিই কল্পনা করিনি।

বিসিএসে অংশ নিতে আগ্রহীদের উদ্দেশে তানভীরের পরামর্শ, সাফল্যের কোনো শর্টকাট পথ নেই। যেকোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধারাবাহিকভাবে লেগে থাকতে হবে। নিয়মশৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস ও আন্তরিকতা থাকলে কঠিন পথও একসময় সহজ হয়ে যায়।

হারিকেনের আলোয় শুরু হওয়া এক কিশোরের স্বপ্ন দেশের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার অন্যতম সেরা সাফল্যে রূপ নিয়েছে। তানভীর রহমানের অর্জন প্রমাণ করে, সীমিত সামর্থ্য নয়, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও নিরলস পরিশ্রমই মানুষকে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।